মহামারি শুরুর পর থেকে জ্বালানি তেলের সবচেয়ে বড় দরপতনের সাথে চলতি প্রান্তিক শেষ হচ্ছে। গত তিন মাসে ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের ফিউচারের দর প্রায় এক-তৃতীয়াংশ কমেছে, যা ২০২০ সালের পর থেকে প্রান্তিক ভিত্তিতে সর্বোচ্চ দরপতন। বর্তমানে সেপ্টেম্বর মাসের সক্রিয় কন্ট্র্যাক্টগুলোর দর ব্যারেলপ্রতি $73-এর উপরে রয়েছে এবং ডব্লিউটিআই-এর দর ব্যারেলপ্রতি $70-এর কাছাকাছি পৌঁছেছে। দরপতনের কারণগুলো অপরিবর্তিত থাকার পাশাপাশি আরও তীব্র হচ্ছে। মার্কিন-ইরান শান্তি চুক্তির অগ্রগতির ফলে হরমুজ প্রণালী দিয়ে তেলের সরবরাহ বেড়েছে এবং মরগান স্ট্যানলি ইতিমধ্যেই সম্ভাব্য বাড়তি সরবরাহের ব্যাপারে সতর্কবার্তা দিয়েছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী, হরমুজ প্রণালী দীয়ে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিক হওয়ার প্রক্রিয়া প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুতগতিতে এগোচ্ছে। মরগান স্ট্যানলির তথ্যমতে, বৃহস্পতিবার ৩৫টি তেল ও গ্যাসবাহী ট্যাঙ্কার এই প্রণালী দিয়ে যাতায়াত করেছে। যুদ্ধের আগের স্বাভাবিক পরিসর বা ৩০-৪০টি জাহাজের সংখ্যায় ফিরে আসার এটিই প্রথম ঘটনা। পাঁচটি বিশাল আকৃতির ট্যাঙ্কার এবং একটি 'সুয়েজম্যাক্স' জাহাজ ইতোমধ্যেই পারস্য উপসাগরে প্রবেশ করেছে, যেগুলোর মাধ্যমে প্রায় ১১ মিলিয়ন ব্যারেল তেল রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে। সামরিক উত্তেজনা বৃদ্ধি এবং জাহাজের ওপর ইরানের হামলার পর সপ্তাহান্তে চলাচলের গতি কিছুটা মন্থর হলেও পরবর্তীতে তা আবার স্বাভাবিক হয়ে আসে।
মরগান স্ট্যানলির নতুন পূর্বাভাস জ্বালানি তেলের ক্রেতাদের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। অতিরিক্ত সরবরাহ পরিস্থিতি তৈরির জন্য যুদ্ধের আগের মাত্রার মাত্র ৬৫ শতাংশে ফিরে আসাই যথেষ্ট; আর ব্যাংকটি ইতিমধ্যেই পরবর্তী প্রান্তিকের জন্য তাদের জ্বালানি তেলের মূল্যের পূর্বাভাস এক-ষষ্ঠাংশ কমিয়ে এনেছে।
কূটনৈতিক পরিস্থিতি এখনও পরস্পরবিরোধী। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে যে মঙ্গলবার দোহায় আলোচনা শুরু হবে, অথচ ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ঘোষণা দিয়েছে যে তারা কেবল একটি বিশেষজ্ঞ প্রতিনিধিদল পাঠাবে এবং সরাসরি আলোচনার সম্ভাবনা নাকচ করে দিয়েছে। হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ নিয়ে বিরোধই এখন আলোচনায় প্রধান বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
তা সত্ত্বেও, জ্বালানি তেলের এখনও দরপতন হচ্ছে এবং এক্ষেত্রে মনস্তাত্ত্বিক বিষয়গুলো গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। ট্রেডাররা মূলত স্বল্পমেয়াদী মনোভাবের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নেয়; হরমুজ প্রণালী দিয়ে জাহাজ চলাচলের পরিস্থিতির দ্রুত উন্নতি দেখে অনেক স্পেকুলেটিভ ট্রেডার তেলের আরও দরপতনের আশায় 'শর্ট পজিশন' ওপেন করছেন। অর্থাৎ, সরবরাহ পুনরুদ্ধারের মৌলিক কারণের সাথে স্পেকুলেশনের চাপ যুক্ত হয়ে তেলের দরপতনের প্রবণতাকে আরও ত্বরান্বিত করছে।
বিশ্ব অর্থনীতির জন্য তেলের এই বড় ধরনের দরপতন মুদ্রাস্ফীতি হ্রাসের একটি মূল কারণ হিসেবে কাজ করছে। যুদ্ধের সময় ব্রেন্ট ক্রুড অয়েলের দাম ব্যারেল প্রতি $100 ছাড়িয়ে গিয়েছিল, যা বর্তমানে কমে $73-এর কাছাকাছি নেমে এসেছে। এই দরপতন সরাসরি মুদ্রাস্ফীতির চাপ কমিয়ে দিচ্ছে, যার প্রতিফলন ইতোমধ্যেই বিভিন্ন পণ্যের দামের তথ্য এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বক্তব্যে দেখা যাচ্ছে। দোহায় অনুষ্ঠেয় আসন্ন আলোচনা থেকে বোঝা যাবে উত্তেজনা প্রশমনের এই ধারাবাহিকতা বজায় থাকবে কি না, নাকি হরমুজ প্রণালীর ভবিষ্যৎ ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংঘাতের জেরে তেলের মূল্য আবারও ভূ-রাজনৈতিক ঝুঁকিজনিত কারণে বৃদ্ধি পাবে।

জ্বালানি তেলের মূল্যের বর্তমান টেকনিক্যাল চিত্র অনুযায়ী, ক্রেতাদের জ্বালানি তেলের মূল্যকে নিকটস্থ রেজিস্ট্যান্স $71.25-এ নিয়ে যেতে হবে। এতে করে জ্বালানি তেলের মূল্যের $76.30-এর লক্ষ্যমাত্রার দিকে যাওয়ার সম্ভাবনা তৈরি হবে, যা ব্রেক করে ঊর্ধ্বমুখী হওয়া বিশেষভাবে চ্যালেঞ্জিং হবে। পরবর্তী লক্ষ্যমাত্রা হিসেবে $81.38 এরিয়া নির্ধারণ করা যেতে পারে। যদি তেলের দরপতন হয়, তাহলে মূল্য $67.77-এ থাকা অবস্থায় বিক্রেতারা মার্কেটের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার চেষ্টা করবে। তারা সফল হলে এই রেঞ্জ ব্রেক করে মূল্য নিম্নমুখী হলে সেটি বুলিশ পজিশনের উপর উল্লেখযোগ্য আঘাত হিসেবে বিবেচিত হবে এবং তেলের মূল্য $59.96 পর্যন্ত নেমে যেতে পারে, যেখানে পরবর্তীতে $51.99 পর্যন্ত দরপতনের সম্ভাবনাও রয়েছে।